পবিত্রতায় মাদকের থাবা: টিকাপাড়া গোরস্থানে রাসিকের ‘বেতনভোগী’
রাজশাহীর ঐতিহ্যের স্মারক এবং হাজারো মানুষের শেষ ঠিকানায় এখন কবরের প্রশান্তির বদলে মাদকের উৎকট গন্ধ। নগরীর অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র ‘টিকাপাড়া গোরস্থান’ এখন অপরাধী ও অসাধু সিন্ডিকেটের অঘোষিত অভয়ারণ্য। যেখানে শায়িত আছেন রাজশাহীর বহু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, সেই পবিত্র মাটির বুক এখন মাদকসেবীদের আসর আর অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ চারণভূমি। অথচ এই পবিত্রতা রক্ষার গুরুদায়িত্বে থাকা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা যেন কেবল ‘মাসোহারা’ গোনা আর মাস শেষে সরকারি বেতন তুলতেই ব্যস্ত; গোরস্থানের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা তাদের কার্যতালিকার তলানিতেও নেই।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার চিত্র। গোরস্থান সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে রাজনৈতিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন শেষে ভেতরের অংশটি পরিণত হয় ময়লার ভাগাড়ে। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন আর খাবারের উচ্ছিষ্ট অবলীলায় নিক্ষেপ করা হচ্ছে প্রাচীন কবরগুলোর ওপর। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, গোরস্থানের পবিত্র সীমানার ভেতর এখন গবাদি পশুর অবাধ বিচরণ। কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় গরু-ছাগল কবরের ওপর চড়ে বেড়ালেও পাহারাদারদের রহস্যজনক নীরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। শ্রদ্ধা ও স্মৃতির এই আঙিনাটি এখন কার্যত গো-চারণভূমিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গোরস্থানের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরেই গড়ে উঠেছে মাদকের নিশ্ছিদ্র আস্তানা। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোরস্থানের পাহারায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ‘ছত্রছায়ায়’ এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সেখানে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের আসর বসে। যেখানে কর্পূরের সুবাস থাকার কথা, সেখানে এখন বাতাসে ভাসে গাঁজা আর হিরোইনের ঝাঁঝালো গন্ধ। মাদকের এই বিস্তারের ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য একা গোর জিয়ারত করা এখন রীতিমতো নিরাপত্তার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহীর সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক শিথিলতা নয়, বরং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতির ওপর চরম অবমাননা। পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি এই অপরাধী চক্রকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। ‘ক্লিন সিটি-গ্রিন সিটি’র তকমা গায়ে মাখা রাজশাহীর হৃদপিণ্ডে এমন অব্যবস্থাপনা এখন শহরের ‘টক অফ দ্য টাউন’।
স্থানীয়দের দাবি, সিটি কর্পোরেশন যেন কেবল কাগজ-কলমে তদন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত এই ‘মাদক সিন্ডিকেট’ নির্মূল করে। একইসাথে গবাদি পশুর প্রবেশ বন্ধ এবং গোরস্থানের পরিচ্ছন্নতা ফিরিয়ে এনে এই পবিত্র স্থানের গাম্ভীর্য রক্ষা করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।