রমজানের পবিত্রতা ও সাধারণ মানুষের জীবনবাস্তবতা
সহমর্মিতা, সংযম এবং আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও আমাদের মাঝে সমাগত পবিত্র রমজান মাস। মুসলিম উম্মাহর কাছে এই মাসটি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবিক গুণাবলি অর্জনের এক অনন্য সোপান। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রমজান এলে সাধারণ মানুষের জীবনে একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি নেমে আসে, অন্যদিকে কিছু রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় যা আমাদের গভীর ভাবনার দাবি রাখে।
রমজানের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এই এক মাস সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রুটিনে আমূল পরিবর্তন আসে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি তারাবিহ এবং কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে এক অপার্থিব শান্তি বিরাজ করে প্রতিটি ঘরে ও মসজিদে। পাড়া-মহল্লায় ইফতার বিনিময়ের যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রচলিত, তা সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে একই সময়ে ইফতার করার এই দৃশ্যটি সাম্যের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
রমজান মাস আসার আগেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর মুনাফালোভী মানসিকতা সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়। সংযমের মাসে যেখানে পণ্যের দাম কমার কথা, সেখানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া করা হয়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য পরিবারের মুখে পুষ্টিকর ইফতার তুলে দেওয়া এখন এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। বাজারের এই অস্থিরতা রমজানের প্রকৃত শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা বোধ জাগ্রত হওয়া এই মুহূর্তে সময়ের দাবি।
রমজানে কর্মজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় বিকেলের যানজট। ইফতারের নির্দিষ্ট সময়ের আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না সড়কগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে অনেককেই রাস্তায় বা বাসের ভেতর ইফতার করতে হয়, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে চরমে নিয়ে যায়। নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে এই চিত্র প্রতিবছরই একই থেকে যাবে।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রমজান আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। সাধারণ মানুষ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দুস্থদের সাহায্য করে এবং জাকাত-ফিতরার মাধ্যমে সম্পদ বণ্টনের একটি আবহ তৈরি হয়। এই যে ত্যাগের মানসিকতা, এটাই রমজানের সার্থকতা। ক্ষুধার্তের কষ্ট অনুভব করার মাধ্যমেই মানুষের প্রতি মানুষের মমতা জন্ম নেয়।
রমজান কেবল উপবাস থাকার নাম নয়, বরং এটি নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করার মাস। বাজারের অশুভ সিন্ডিকেট দমন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে সাধারণ মানুষের জন্য রমজান আরও বেশি স্বস্তিদায়ক হবে। আমরা আশা করি, রমজানের এই শিক্ষা কেবল এক মাসের জন্য নয়, বরং সারা বছরের পাথেয় হয়ে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে প্রতিফলিত হবে। একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক সমাজ গঠনে রমজানের চেতনা আমাদের পথ দেখাবে।
লেখক : আবুল হাসনাত অমি
সম্পাদক ও প্রকাশক,সিটি নিউজ রাজশাহী।