"রাজশাহী-৩: প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা"
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে ভোটের হিসাব সহজ। আসনটি বারবার আওয়ামী লীগ-বিএনপির দখলেই থেকেছে। এবার ব্যালটে নৌকা নেই। তাই এ আসনে এবার বিএনপির প্রার্থীর জন্য বড় সুযোগ মনে করছেন ভোটাররা। তবে এ আসনের ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং সদস্যরা (মেম্বার)।
রাজশাহী শহরের চারপাশ ঘিরে আছে পবা উপজেলা। আর পবার পাশে নওগাঁর মান্দা পর্যন্ত মোহনপুর উপজেলা। এ দুই উপজেলা নিয়েই গঠিত আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৯৯ জন। তাদের সামনে প্রার্থী ছয়জন। এরমধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল হক মিলন আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের।
এছাড়া প্রচার শুরুর পরে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে ভোটের মাঠে আসা মোহনপুর উপজেলা কৃষকলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবা বেগমও আছেন আলোচনায়। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীও পেতে পারেন কিছু ভোট। ২০২৪ সালের মে মাসে হাবিবা বেগম প্রায় ৪৩ হাজার ভোট পেয়ে মোহনপুর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরা তাকে ভোট দিতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।
তবে ভোটের মাঠে বিকল্প হিসাবও সামনে আছেন। এ আসনের জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ একটানা ২৮ বছর ধরে পবার হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের ইউপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পর পর পাঁচবার তিনি এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশ চেয়ারম্যান সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। দুই উপজেলার প্রায় সব সাবেক চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা আওয়ামী লীগ করলেও তাদের সঙ্গে ছিল তার সুসম্পর্ক।
এছাড়া সুসম্পর্ক ছিল এ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আয়েন উদ্দিনের সঙ্গেও। আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগম কৃষক লীগের নেত্রী হলেও আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে ছিল তার দা-কুমড়া সম্পর্ক। সেদিক থেকে আবুল কালাম আজাদ আওয়ামী লীগের সমর্থন পেতে পারেন বলে অনেকেই মনে করছেন। এমনটি হলে এ আসনে দাঁড়িপাল্লা জিতেও যেতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পবা উপজেলায় ৮টি ও মোহনপুরে ৬টি ইউপি রয়েছে। এই ১৪ ইউপির সবগুলো ইউপির চেয়ারম্যানেরাই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। এরমধ্যে শুধু পবার পারিলা ইউপির চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ নির্বাচিত হয়েছিলেন স্বতন্ত্র নির্বাচন করে। গণঅভ্যুত্থানের পর শুধু তিনিই এখনও দায়িত্ব পালন করছেন। বাকিরা পলাতক।
তবে তারা এখনও ভোটের কলকাঠি নাড়তে পারেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একজন সাংবাদিক। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি এলাকায় চেয়ারম্যানদের নিজস্ব কিছু ভোট রয়েছে। এই ভোটগুলো জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, তিনি জামায়াত করলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই চলতেন। এ জন্য আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি নির্বিঘ্নে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। বিশেষ করে পবার চেয়ারম্যানদের মধ্যে তখন খুব একতা ছিল। তারা দল-মত বিবেচনা করতেন না।’
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পলাতক চেয়ারম্যানরা ভাবতে পারেন তাদের দীর্ঘদিনের সহকর্মী আবুল কালাম আজাদ সংসদ সদস্য হলে তারা এলাকায় ফিরতে পারবেন। সেই চিন্তা থেকে ভোটের মাঠে তারা জামায়াতের পক্ষ নিতে পারেন। তারা মেম্বারদেরও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিতে পারেন। এ রকম হলে ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে।
গত ২৮ জানুয়ারি দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ পারিলা ইউনিয়নের কালুমেড় এলাকায় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ও মসজিদের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। সেদিন তার সঙ্গে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদকেও দেখা যায়। সাঈদ আলী আওয়ামী লীগ করতেন। তবে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে। যদিও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আয়েন উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি।
তাকে আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে দেখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে তো জামায়াত-শিবিরই ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান বানিয়েছে। আওয়ামী লীগ তো ভোট দেয়নি। সেদিন মসজিদ উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি এসেছেন। তখন তো চলে যেতে পারি না।’
নির্বাচনে পলাতক চেয়ারম্যানদের অবস্থান কী, জানতে চাইলে সাঈদ আলী বলেন, ‘সব চেয়ারম্যান যখন ছিল, তখন আমরা দল দেখিনি। সবাই মিলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েই থেকেছি। এখন মিলন চাচাও আমার, কালাম চাচাও আমার। যার যাকে ইচ্ছা ভোট দেবে।’
জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চেয়ারম্যানরা তো কেউ এলাকায় নেই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে না, মোবাইল বন্ধ। দু’একজনকে হয়ত পাওয়া যাবে। সুযোগ পেলে তারা আমারই কাজ করবে, ইনশাআল্লাহ। পুরাতন চেয়ারম্যান যারা ছিল, তারা এলাকায় আছে এবং আমার জন্য কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যানরা চায় আমি এমপি নির্বাচিত হই এবং স্থানীয় সরকার নিয়ে কিছ কাজ করি। সবাই স্থানীয় সরকার বিভাগ নিয়ে বড় বড় কথা বলে, কিন্তু করে না। আমি মন্ত্রী না হলেও যদি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হই, এ বিষয়ে কাজ করতে পারব বলে তারা মনে করে।’
ভোটের মাঠে হিসেব-নিকেশ যা-ই থাকুক না কেন এবার নিজের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী শফিকুল হক মিলন। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক এই সহ-সম্পাদক সারাদিন দুই উপজেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
শফিকুল হক মিলন বলেন, এলাকায় ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা এই জোয়ারে ভেসে যাবে। তিনি বলেন, পবা-মোহনপুরের সবখানেই রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। মানুষ বলছে, তারা ভোট দেবে; কিন্তু রাস্তাটা করে দিতে হবে। জামায়াতের প্রার্থী দীর্ঘদিন হড়গ্রাম ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু নিজের এলাকারই উন্নয়ন করতে পারেননি। তাকে দিয়ে দুই উপজেলার উন্নয়ন হবে, এটা মানুষ বিশ্বাস করে না।